10 August 2026

শান্তিপূর্ণ নির্বাসন

মাঝে মাঝে ভাবি, লেখা ব্যাপারটা এত সহজ, অথচ বলা ব্যাপারটা এত কঠিন কেন?

উত্তরটা অবশ্য খুব দূরে খুঁজতে যেতে হয় না। 
কাউকে মন খুলে কিছু বলতে গেলেই উত্তরটা নিজের থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়।

ভগবান বোধহয় বেশ ভেবেচিন্তেই মানুষকে দুটো কান আর একটা মুখ দিয়েছিলেন—শোনার পরিমাণ যেন বলার চেয়ে দ্বিগুণ হয়। 
কিন্তু মানুষ বোধহয় সৃষ্টিকর্তার এই নকশাটাকেই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষা করেছে। 
মুখ চালাতে আমাদের যত উৎসাহ, কান চালাতে ততটাই অনীহা।

কেউ চুপ করে থাকলে আমরা ধরে নিই সে বুঝি হেরে গেল। 
কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে মনে হয়, তার অজ্ঞতা ধরা পড়ে গেল। 
অথচ ‘আমি জানি না’ বলতে পারাটাও যে এক ধরনের বুদ্ধিমত্তা, এই উপলব্ধিটুকু আমাদের অহংকারের অভিধানে বোধহয় এখনও ঢোকেনি।

তার চেয়েও মজার মানুষ আছেন। 
কোনো একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলেন, দেখা গেল বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। এখানেই স্বাভাবিক মানুষের মতো থেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু না! 
আত্মসম্মান বড় বিচিত্র জিনিস, জ্ঞান না থাকলেও আত্মবিশ্বাসের কোনো ঘাটতি থাকে না। 
শুরু হয় শাক দিয়ে মাছ ঢাকার এক মহড়া। 
প্রসঙ্গ ঘোরে, যুক্তি বেঁকে যায়, গল্পের ডালপালা বাড়ে, শুধু ‘আমি জানি না’ কথাটাই আর মুখ দিয়ে বেরোয় না।

লেখার জগৎটা অন্তত এত নিষ্ঠুর নয়।

এখানে আমি আমার কথাটা শেষ না করা পর্যন্ত কেউ মাঝখানে এসে বলে উঠতে পারে না, "আমি বলছি..."
কেউ চোখ উল্টে দিতে পারে না, কেউ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতে পারে না, কেউ নিজের অজ্ঞতাকে জ্ঞানের পোশাকে সাজিয়ে কথার ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না।

আমি লিখি নিজের মতো করে। 
যতক্ষণ না মনের কথাগুলো শেষ হয়, ততক্ষণ কাগজ বা পর্দা চুপচাপ শুনে যায়।

কী আশ্চর্য শান্তি!

তার ওপর সবার আবার লেখায় রুচি নেই। 
ফলে হস্তক্ষেপও তুলনামূলক কম। 

তাই লিখতে বসলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। 
মনে হয়, অন্তত এখানে কথাগুলোকে শেষ পর্যন্ত নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়া যায়।

আর বলতে গেলেই?

মাথা ধরে যায়।

কারণ কথা বলার সময় শুধু নিজের কথাই বলতে হয় না, অন্যের অজ্ঞতা, অহংকার, অশ্রবণশক্তি আর অপ্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাসও সামলাতে হয়।

লেখার সময় এসবের কোনো বালাই নেই।

লেখা তাই আমার কাছে শুধু মনের কথা প্রকাশের জায়গা নয়—এটা একপ্রকার শান্তিপূর্ণ নির্বাসন।

~🖋️পৌলমী ©

No comments: